অবশেষে অপসারণ হচ্ছে রাশেদ মাকসুদ

২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট, এক অপ্রত্যাশিত মুখ—খন্দকার রাশেদ মাকসুদ—অবতীর্ণ হয়েছিলেন বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অভিভাবক হিসেবে। সরকার তাকে বসিয়েছিল বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের দায়িত্বে।

অভিযোগের তীর—একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টার ‘সুপারিশে’ নাকি এই ‘অচেনা’ ব্যক্তিটি পেয়েছিলেন শেয়ারবাজারের সর্বেসর্বা হওয়ার সুযোগ। কিন্তু তার ‘অপরিপক্ক’ নেতৃত্বে ক্রমশ ধূলিসাৎ হয়েছে পুঁজিবাজার, ভেঙেছে স্বপ্ন সেইসব বিনিয়োগকারীর, যারা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একটি শক্তিশালী বাজারের প্রত্যাশা করেছিলেন।

মাকসুদের দায়িত্ব গ্রহণের সেই দিন থেকে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত, এই ১৭৪টি কার্যদিবসে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচক কমেছে ৮৪৩ পয়েন্ট—যা শতাংশের হিসাবে ১৪ শতাংশের বেশি। বাজার মূলধন উড়ে গেছে ৪৪ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। এই পরিস্থিতিতে বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে প্রায়শই রাস্তায় নেমে এসেছেন ‘সাধারণ’ বিনিয়োগকারীরা। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে, সরকার নাকি এখন বিএসইসিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের কথা ভাবছে। এমনটাই জানাচ্ছে বিশ্বস্ত সূত্র।

ব্যাংকিংয়ে দীর্ঘ কর্মজীবন কাটানো রাশেদ মাকসুদ যখন বিএসইসির আসনে বসেন, তখন ডিএসইর প্রধান সূচক ছিল ৫ হাজার ৭৭৮ পয়েন্ট। এরপর সূচক সামান্য বাড়লেও, ক্রমশ তা নিম্নমুখী হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সেই সূচক নেমে ঠেকেছে ৪ হাজার ৯৩৫ পয়েন্টে। অথচ সরকার পরিবর্তনের পর আশায় বুক বেঁধেছিলেন বিনিয়োগকারীরা। দীর্ঘ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা ধুঁকেছেন, সেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বাজারমুখী হয়েছিলেন। সেই সময় ডিএসইর প্রধান সূচক ৭ হাজার ১০০ পয়েন্টের ঘর ছুঁয়েছিল, দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ছাড়িয়ে গিয়েছিল ২ হাজার কোটি টাকা।

গত বছরের ১১ আগস্ট লেনদেন হয়েছিল ২ হাজার ১০ কোটি টাকার শেয়ার। তখন বিএসইসির নেতৃত্ব ছিল শূন্য। কিন্তু রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নেওয়ার দিনই লেনদেন নেমে আসে ৪৮০ কোটি টাকায়। আর গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে মাত্র ২৯১ কোটি টাকার। ডিএসইর লাগাতার পতন তো আছেই, তার ওপর যোগ হয়েছে লেনদেন খরা। এতে শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নন, অসন্তোষের আগুন জ্বলছে ব্রোকারেজ হাউসগুলোতেও। নামমাত্র লেনদেনে তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, দিনের পর দিন পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন। আর এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বিএসইসির নেওয়া পদক্ষেপগুলো এখনো পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক ফল দেখাতে পারেনি। তাই বিনিয়োগকারীরা এখন এমন একজন ক্যারিশম্যাটিক ও পুঁজিবাজারের জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ নেতৃত্ব চাইছেন, যার ওপর তাদের আস্থা ফিরবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে এক্সচেঞ্জ কমিশনের আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। ভালো মানের কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো দৃশ্যমান উদ্যোগ নিলে হয়তো বিনিয়োগকারীদের ভরসা কিছুটা হলেও ফিরত। বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, সামনে এই বিষয়গুলোতে গুরুত্ব না দিলে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মুখে পড়তে পারে শেয়ারবাজার। রাশেদ মাকসুদ কমিশনে আস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ায়, বাজার থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। বাজারের আরও পতনের আশঙ্কায় নতুন কোনো বিনিয়োগে যেতে সাহস পাচ্ছেন না অনেকেই। তারা এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন বলে খবর।

একটি ব্যাংকের শেয়ার বিভাগের প্রধান, নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বন্ধ রেখেছে। কারণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের আস্থা নেই। আগে যেটুকু বিনিয়োগ করা হয়েছিল, তাও এখন তলানিতে ঠেকেছে। এই নিয়ে ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা চরম উদ্বেগে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চাইছে না তারা।

জানা গেছে, দীর্ঘদিনের শেয়ারবাজারের পতনের জেরে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ১৮ লাখ থেকে কমে ৭ লাখে এসে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইকবাল হোসাইন বলেছেন, গত আট মাসে পুঁজিবাজারের সূচক কেবল নিম্নমুখী হয়েছে, একবারের জন্যও ঊর্ধ্বমুখী হয়নি। এই সময়ে অনেক বিনিয়োগকারী তাদের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পুঁজি হারিয়েছেন।

বাজারের পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদের মত, ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকসহ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সেদিকে ঝুঁকছেন। সরকারি বিল ও বন্ডের সুদের হার ১২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এখানে বিনিয়োগ লাভজনক ও ঝুঁকিমুক্ত হওয়ায় অনেকে বাজার থেকে টাকা তুলে সেখানে বিনিয়োগ করছেন। এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, আগামী বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য প্রণোদনা দেওয়া জরুরি।

সংকটে ব্রোকারেজ হাউসগুলো: পুঁজিবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলো ব্রোকারেজ হাউসগুলো। বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনাবেচায় সাহায্য করার পাশাপাশি তারা বিভিন্ন আর্থিক পরিষেবা দিয়ে থাকে, যার বিনিময়ে কমিশন বা সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে আয় করে। তাদের আয়ের প্রধান উৎস হলো লেনদেন কমিশন। প্রতিটি শেয়ার কেনাবেচার ওপর একটি নির্দিষ্ট কমিশন ধার্য করা হয়। বিনিয়োগকারীদের প্রতিটি অর্ডারের বিপরীতে ব্রোকাররা এই কমিশন পেয়ে থাকে, যা তাদের প্রধান আয়ের ভিত্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ৩০০ থেকে ৪০০ কোটির ঘরে থাকায় তাদের আয় তলানিতে এসে ঠেকেছে। ফলে ব্রোকার হাউসগুলো চরম সংকটের মধ্যে পড়েছে, দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, এমন চরম দুঃসময় তাদের আগে কখনো আসেনি। বর্তমানে যে হারে লেনদেন হচ্ছে, তাতে তাদের ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

বছরের সর্বনিম্ন লেনদেন, বিক্ষোভ: দেশের শেয়ারবাজারে দরপতনের ধারা অব্যাহত ছিল, সেই সাথে ছিল লেনদেন খরা। গত মঙ্গলবার ডিএসইতে চলতি বছরের সর্বনিম্ন লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। একই সাথে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার পাশাপাশি কমেছে সবকটি মূল্যসূচক। অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই)-তেও একই চিত্র দেখা গেছে, যদিও লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে।

এদিকে শেয়ারবাজারে লাগাতার দরপতনে অতিষ্ঠ বিনিয়োগকারীরা রাজধানীর মতিঝিল এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)-এর সামনে বিক্ষোভ করেছেন। এসব বিক্ষোভ থেকে বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে অপসারণ এবং তার দুর্নীতির দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

এর আগে গত সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবস এবং তার আগের সপ্তাহে চার কার্যদিবস অর্থাৎ টানা নয় কার্যদিবস শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছিল। যদিও গত সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার ডিএসইতে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার পাশাপাশি সূচক বেড়েছিল, তবে সিএসইতে পতনের ধারা অব্যাহত ছিল। সোমবার ডিএসই ও সিএসই উভয় বাজারেই ফের দরপতন হয়।

এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার মধ্য দিয়ে। ফলে লেনদেনের শুরুতেই সূচক ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। মাঝে কিছুক্ষণের জন্য সূচক সামান্য ঊর্ধ্বমুখী হলেও শেষ পর্যন্ত দরপতনের পাল্লা ভারী হয়। দিনের লেনদেন শেষে সব খাত মিলিয়ে ডিএসইতে মাত্র ১৩৬টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার তালিকায় নাম লেখাতে পেরেছে। বিপরীতে দাম কমেছে ২১১টির, আর ৫০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। সার্বিকভাবে দাম কমার তালিকায় বেশি প্রতিষ্ঠান থাকায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ১৭ পয়েন্ট কমে ৪ হাজার ৯৩৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

শেয়ার করুন:-

সম্পর্কিত খবর