প্রভাবশালী দোসররা অক্ষত: ইবিএল ব্যাংকের এএমডি শাহীন এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে

বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর ব্যাংকিং খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসলেও, পুরনো লুটেরা চক্র এখনো তৎপর। ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে আহমেদ শাহিনকে এনআরবিসি ব্যাংকে এমডি হিসেবে নিয়োগ করতে গিয়েও পারেনি জুলাই আন্দোলনের কারণে। ৫ আগস্ট গণঅভুত্থানের কারণে এনআরবিসি ব্যাংকে এমডি হিসেবে নিয়োগ আটকে যায়। ফলে চতুর শাহিন তমাল পারভেজের পরামর্শে আবার ইস্টার্ন ব্যাংকে যোগদান করেন। পূর্বের কুখ্যাত ব্যাংক লুটেরা তমাল পারভেজ বর্তমানে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসিকে (ইবিএল) লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছেন। এই ষড়যন্ত্রে তার সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন ব্যাংকটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) আহমেদ শাহীন। আর তাদেরকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ বিআরপিড ও ডস এর কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এই পরিস্থিতি ব্যাংকিং খাতের জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্রে জানা য়ায়, শাহীন ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান ইবিএল সিকিউরিটিজের পরিচালক হওয়ার সুবাধে পারভেজ তমালের সাথে মিলে শেয়ারবাজারে কারসাজিতে জড়িয়ে পড়ে।অর্থাৎ পারভেজ তমালকে শেয়ারবাজার থেকে লুটপাট করার সহযোগিতার সুবাধে আরও ঘনিষ্ট হওয়ার সুযোগ পায় শাহীন। তমাল পারভেজ বঙ্গবন্ধু পরিষদ রাশিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর এনআরবিসি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করা হলে ফরাছত আলীকে সরিয়ে চেয়ারম্যান হন এস এম পারভেজ তমাল। এরপর ব্যাংকটিতে পূর্ণকালীন অফিস করে তিনি এটাকে নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। ২০১৮ সালের পর ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নেই এমন ব্যক্তিদের ব্যাংকটির শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিতে খোলা হয় আলাদা কোম্পানি। গড়ে তোলা হয় বিশেষ গ্রুপ, যারা ব্যাংকের সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিত। আবার ঋণ দেওয়া হয় পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে। এ ছাড়া বাজেয়াপ্ত শেয়ার ক্রয় ও ব্যাংকের উপশাখার সব ব্যবসা এনজিও এসকেএস ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পনির্ভর করে ফেলা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের নিকটাত্মীয়কে নিয়োগ দেওয়া হয় শীর্ষ পদে। ফলে নানা অনিয়মের পরও ব্যাংকটির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন ব্যাংকটির দিকে নজর দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন ব্যাংকটির দিকে নজর দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকের চেয়ারম্যান বহুল আলোচিত পারভেজ তমালের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও দায়ের হয়েছে। তবে তিনি এখনো গ্রেপ্তার হননি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুকম্পা পেতে তদবির করছেন এ বিতর্কিত ব্যক্তি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো বেশ কয়েকটি অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। উল্লেক্ষ্য তার সকল ব্যাংক হিসেব জব্দ করে রেখেছে বাংলাদেশ ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফ আই ইউ)। তমাল পারভেজের নতুন টার্গেটের মধ্যে একটি হল ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি। এই ব্যাংকটি বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এক সময়ে কঠিন সময় পার করলেও ব্যাংকটি বাংলাদেশী জনগণের আস্থার নাম হয়ে উঠেছে।

জানা গেছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে গত কয়েক মাস ধরে ইবিএলে কিছুটা অস্থিরতা চলছিল, বিশেষ করে যখন ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরী কিছু বিতর্কিত কার্যকলাপে জড়িত থাকার জন্য বিএফআইইউ কর্তৃক কিছু তদন্তের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই তমাল পারভেজের নেতৃতে ব্যাংক ডাকাত দলটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। তমাল পারভেজ দীর্ঘদিন ধরে ইবিএলের উপর নজড় রেখেছিলেন। গত বছর এনআরবিসি ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠনের আগে আহমেদ শাহীনকে (বর্তমানে ইবিএল এর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন) এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত করেন তমাল। (যথাযথ যোগ্যতা এবং প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও এবং দীর্ঘ সময় ধরে কোনও ব্যাংকে টিকে থাকতে না পারার রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও)।

সূত্র বলছে, কিন্তু গত বছরের ১৭ মার্চ আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও ব্যাংকিং কার্যক্রমে শৃঙ্খলা আনতে এনআরবিসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যারা এসব ব্যাংকের তত্ত্বাবধান করবে। যার ফলে তমাল পারভেজের আস্থাভাজন আহমেদ শাহীনের নিয়োগ বাতিল করা হয়। এরপর তিনি ফিরে আসেন এবং আবার ইস্টার্ন ব্যাংকে যোগদান করেন এবং তমালের নির্দেশে ইবিএলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেন। আহমেদ শাহীনের পুরো পরিবার ফ্যাসিস্ট শাসনামলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিল। তার ভাই ঢাকার প্রাক্তন ডিসি ছিলেন এবং ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার জুলাই যোদ্ধার হত্যার সাথে জড়িত ছিলেন এবং সরকারের পতনের পর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত গা ঢাকা দিয়ে আছেন এবং তার ভাইয়ের স্ত্রী ছিলেন ইআরডির সচিব এবং অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি।

আহমেদ শাহীন তমাল পারভেজের পরামর্শক্রমে ইবিএলে পুনরায় যোগদান করেন এবং ব্যাংকের ভেতরের সব আলামত সংগ্রহ করতে থাকেন তার পূর্ণ স্বার্থ হাসিলের জন্য। শাহীন ব্যাংক দখলের পাশাপাশি তমাল পারভেজ ও এনআরবিসি ব্যাংকের আরেক পরিচালক আদনান ইমামের কোম্পানী জেনেক্স ইনফোসিস শেয়ার কারসাজির অন্যতম হাত। এছাড়াও ইবিএল সিকিউরিটিজের (ইবিএলের সাবসিডিয়ারী প্রতিষ্ঠান) মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শেয়ার কারসাজির পেছনে ভুমিকা রেখেছেন।

এবিষয়ে জানতে আহমেদ শাহীনকে একাধিকবার মুঠোফোন যোগাযোগ করা হলেও কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এবিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, আহমেদ শাহীন এবং পারভেজ তমাল বিগত সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিড বিভাগের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সুসর্ম্পক গড়ে তোলেন যার প্রভাব এখনও রয়েছে। আহমেদ শাহিনের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু এখনও বিআরপিড এবং ডস এ দায়িত্বে আছেন। ফলে তাঁর এখনও সবকিছু আগের মতোই আছে।

শেয়ার করুন:-

সম্পর্কিত খবর